প্রলয়ের নাম শ্বেতহিম

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ (মে ২০২৬)

Muhammadullah Bin Mostofa
  • 0
  • 0
  • 0
আকাশটা হঠাৎ নীল থেকে বেগুনি হয়ে গেল। অর্ক তখন ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল। উত্তর আকাশ থেকে একটা তীব্র আলোর রেখা ধেয়ে এল মাটির দিকে। কোনো আওয়াজ নেই। শুধু এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো হাজারটা সূর্য একসাথে জ্বলে উঠেছে। পরক্ষণেই ধেয়ে এল সেই প্রলয়ঙ্করী শব্দতরঙ্গ। অর্ক ছিটকে পড়ল মেঝেতে। কানের পর্দা ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। চারদিকের অট্টালিকাগুলো বালির পাহাড়ের মতো ধসে পড়ছে। কলকাতার সেই চিরচেনা জ্যাম, মানুষের চিৎকার, ট্রামের ঘণ্টি—সব এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। অর্ক জানত এই দিনটা আসবে। খবরের কাগজের হেডলাইনগুলো কয়েক মাস ধরেই যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছিল। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, প্রশান্ত মহাসাগর—সবখানে দাউদাউ করে জ্বলছিল আগুন। বড় বড় রাষ্ট্রনায়করা জেদের খেলায় মেতেছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো বিশ্বাস করতে চায় না যে তাদের সাজানো সংসার এক লহমায় ধুলো হয়ে যেতে পারে। অর্ক দেখল আকাশের সেই বেগুনি রং এখন ছাইয়ের কালোয় ঢেকে যাচ্ছে। সূর্য হারিয়ে গেছে। শুরু হলো পারমাণবিক শীতের অন্ধকার। শহরটা মরে গেছে। কিন্তু অর্ককে বাঁচতে হবে। সে ধুঁকতে ধুঁকতে নিচে নামল। তার পিঠে একটা ঝোলা। তাতে কিছু শুকনো খাবার, একটা টর্চ আর তার সবচেয়ে প্রিয় ডায়েরিটা। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখল প্রতিবেশীদের নিথর দেহ পড়ে আছে। কারও গায়ে আঘাত নেই, শুধু তেজস্ক্রিয়তার অদৃশ্য ছোবলে প্রাণপাখি উড়ে গেছে। অর্ক রাস্তায় বেরোতেই দেখল আকাশ থেকে কালো তুষার পড়ছে। তেজস্ক্রিয় ছাই। সে তার মুখটা রুমাল দিয়ে ঢেকে নিল। সাত দিন কেটে গেছে। দিন আর রাতের কোনো পার্থক্য নেই। সূর্য এখন এক ফ্যাকাশে থালার মতো মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকে। অর্ক এখন আশ্রয় নিয়েছে ময়দান মেট্রো স্টেশনের গভীরে। সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। মানুষের গায়ের গন্ধে বাতাস ভারী। কারও পেটে খাবার নেই, কিন্তু চোখে তীব্র হিংসা। একটা বিস্কুটের জন্য মানুষ একে অপরের গলা টিপে ধরছে। এখানে আইন নেই, আদালত নেই। আছে শুধু টিকে থাকার আদিম প্রবৃত্তি। সেখানেই অর্কর সাথে দেখা হলো সুলতানার। সুলতানা একজন ডাক্তার। এই নরকেও সে তার ভাঙা স্টেথোস্কোপ দিয়ে মানুষের সেবা করার চেষ্টা করছে। সুলতানা অর্কর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। সে বলল, মানুষ এত দ্রুত পশু হয়ে যায় আগে বুঝিনি অর্কবাবু। বাইরে পারমাণবিক বোমা ফেটেছে, আর ভেতরে ফেটেছে মানুষের মুখোস। সুলতানা তার একমাত্র জলের বোতলটা একটা তৃষ্ণার্ত শিশুকে দিয়ে দিল। অর্ক দেখল মেয়েটার সাহসিকতা। হঠাৎ স্টেশনের ওপর দিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো। মাটি কাঁপছে। সৈন্যরা আসছে। কিন্তু তারা কারা? দেশের রক্ষক নাকি লুটেরা? কোনো তফাত নেই। তাদের হাতে একে-৪৭, আর চোখে রক্তের নেশা। তারা খাবার আর ওষুধের সন্ধানে স্টেশনে হানা দিয়েছে। তারা বাছাই করছে সুস্থ মানুষদের। যাদের শক্তি আছে তাদের দাসের মতো খাটানো হবে বাংকার তৈরির কাজে। অর্ক আর সুলতানা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে টানেলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। সামনে অনিশ্চিত গন্তব্য, পেছনে মৃত্যুর হাতছানি। টানেল দিয়ে মাইলকে মাইল হাঁটার পর তারা বেরোলো শহরের উপকণ্ঠে। সেখানে দৃশ্য আরও ভয়াবহ। গঙ্গার জল কালো হয়ে গেছে। মাছগুলো মরে ভেসে আছে। চারদিকে একটা উৎকট গন্ধ। অর্ক দেখল একটা পরিত্যক্ত ল্যাবরেটরি। ল্যাবরেটরির ভেতরে তারা খুঁজে পেল কিছু গোপন নথি। সেখানে লেখা ছিল, এই যুদ্ধটা স্রেফ ক্ষমতার লড়াই ছিল না। এটা ছিল জনসংখ্যা কমানোর এক আন্তর্জাতিক ছক। নথিতে দেখা গেল, পৃথিবীর উত্তরাংশ প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে। যারা বেঁচে আছে, তারা দক্ষিণের দিকে ছুটছে। দক্ষিণ গোলার্ধে নাকি তেজস্ক্রিয়া কম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথ দুর্গম। অর্ক আর সুলতানা একটা পুরনো জিপ গাড়ি খুঁজে পেল। কপাল ভালো যে ইলেকট্রনিক্স সব বিকল হলেও এই পুরনো ইঞ্জিনের গাড়িটা স্টার্ট নিল। তারা যাত্রা শুরু করল সমুদ্রের দিকে। পথে পদে পদে বিপদ। কোথাও দাঙ্গাকারী, কোথাও ক্ষুধার্ত নেকড়ে, আবার কোথাও তেজস্ক্রিয় কুয়াশা যা মানুষকে নিমেষে অন্ধ করে দেয়। এক রাতে তারা আশ্রয় নিল একটা ভাঙা মন্দিরে। সুলতানা আগুনের পাশে বসে কাঁদছিল। সে তার বাবাকে হারিয়েছে, তার সাজানো ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে মিসাইল। অর্ক তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। সে ডায়েরিতে লিখল— সভ্যতা মানে সুন্দর ঘর বা কম্পিউটার নয়। সভ্যতা মানে হলো অন্য মানুষের দুঃখ বুঝতে পারা। আজ আমরা অসভ্য হয়ে গেছি। হঠাৎ মন্দিরের বাইরে কারুর পায়ের শব্দ শোনা গেল। অর্ক তার ছুরিটা শক্ত করে ধরল। অন্ধকারে জলজ্বল করছে কয়েক জোড়া চোখ। তারা মানুষ নয়, মানুষের অবয়বে থাকা ক্ষুধার্ত নেকড়ে। সেই লড়াইটা ছিল রক্তক্ষয়ী। অর্ক আর সুলতানা কোনোমতে প্রাণে বেঁচে ফিরল। কিন্তু অর্কর বাঁ হাতে গভীর ক্ষত। সুলতানা বনের লতাপাতা আর তার কাছে থাকা সামান্য ওষুধ দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করল। তাদের গাড়িটা আর চলছে না। এখন তারা পায়ে হেঁটে এগোচ্ছে। পথে দেখা হলো হাজার হাজার মানুষের মিছিলে। তারা সবাই উদ্বাস্তু। কেউ সিরিয়া থেকে এসেছে, কেউ এসেছে উত্তর ভারত থেকে। সবার চোখে একটাই স্বপ্ন—জীবন। সীমান্তে পৌঁছাতেই দেখা গেল বিশাল দেওয়াল। আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে। যারা দক্ষিণ থেকে এসেছে, তারা উত্তরাঞ্চলের মানুষদের ঢুকতে দেবে না। এক সময় যারা বিশ্বায়নের কথা বলত, তারাই এখন কাটাতারের বেড়া দিয়েছে। অর্ক দেখল একটা ছোট বাচ্চা তার মায়ের লাশের পাশে বসে কাঁদছে। তার কান্না শোনার কেউ নেই। রাজনীতির মানচিত্রে এখন মানুষের কোনো দাম নেই, দাম আছে শুধু ভূগোলের। সুলতানা বলল, অর্ক, আমাদের ওই দেওয়াল পার হতে হবে। অর্ক জানত এটা আত্মহত্যার শামিল। কিন্তু পিছে ফিরে যাওয়ার আর জায়গা নেই। তারা একদল বিদ্রোহীর সাথে যোগ দিল। সেই বিদ্রোহীরা রাতে দেওয়াল টপকানোর পরিকল্পনা করছে। চারদিকে টানটান উত্তেজনা। সার্চলাইটের আলো আকাশ চিরে দিচ্ছে। অর্ক আর সুলতানা হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। হঠাৎ একটা সাইরেন বেজে উঠল। সৈন্যরা গুলি চালানো শুরু করল। অন্ধকারে সুলতানার হাত ছেড়ে দিল অর্ক। গুলির শব্দ আর আর্তনাদের মাঝে সে সুলতানার নাম ধরে চিৎকার করল। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। অর্ক নিজেই কোনোমতে দেওয়াল পার হয়ে ওপারে আছড়ে পড়ল। তার শরীরে অজস্র ক্ষত। সে জ্ঞান হারাল। যখন তার জ্ঞান ফিরল, সে দেখল সে একটা সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছে। অনেকদিন পর সে দেখল নীল আকাশ। মেঘগুলো পরিষ্কার হয়ে আসছে। তেজস্ক্রিয় কুয়াশা এখানে নেই। সে একটা শিবিরের ভেতর আছে। সেখানে রেড ক্রসের পতাকা উড়ছে। অর্ক সুলতানাকে খুঁজতে লাগল। পাগলের মতো ঘুরে বেড়াল প্রতিটি তাবুতে। অবশেষে দেখল একটা সাদা পর্দা ঘেরা ঘরে সুলতানা বসে আছে। সে আহতদের ব্যান্ডেজ বাঁধছে। সুলতানা অর্ককে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। তারা বেঁচে আছে। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ মরে গেছে, কিন্তু প্রাণের ধারা শুকিয়ে যায়নি। অর্ক তার ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল। সে লিখল— তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ জিতে নিয়েছে মৃত্যু। কিন্তু হেরে গেছে ঘৃণা। আমরা যারা বেঁচে আছি, আমাদের কাজ হলো আবার নতুন করে ভালোবাসতে শেখা। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের রোপণ করতে হবে আগামী দিনের চারাগাছ। দূরে সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। জোয়ার আসছে। নোনা বাতাস শরীরে মেখে অর্ক আর সুলতানা দিগন্তের দিকে তাকাল। সূর্য উঠছে। সেই আদিম, চিরন্তন সূর্য। যা রাজাদের চেনে না, চেনে শুধু জীবনকে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে। শুরু হয়েছে আরও কঠিন এক লড়াই—মানুষ হওয়ার লড়াই। এই পোড়া মাটিতেই আবার ফুল ফুটবে। সভ্যতা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে, তবে হয়তো অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো মায়ার টানে। মানুষের গল্প কখনো ফুরায় না, তা শুধু বাঁক বদলায়। যেমনটা আজ বদলে গেল এই মহাপ্রলয়ের শেষে। আকাশটা আবার নীল হবে। পাখিরা ফিরে আসবে। আর কোনো এক সন্ধ্যায় হয়তো কোনো লেখক লিখবে এই ধ্বংসের দিনগুলোর কথা, যাতে আগামীর মানুষ ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে। অর্ক সুলতানার হাতটা শক্ত করে ধরল। সামনে দিগন্তের আলো আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। পৃথিবীর নতুন অধ্যায় শুরু হলো আজ থেকে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

আকাশটা হঠাৎ নীল থেকে বেগুনি হয়ে গেল। অর্ক তখন ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল

২৬ জানুয়ারী - ২০২২ গল্প/কবিতা: ৪৪ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

বিজ্ঞপ্তি

“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।

প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী